লোকগাথা, আধ্যাত্মিক বিশ্বাস আর পাখির কলকাকলিতে মুখরিত যে গাছটি ছিল কালের সাক্ষী, সড়ক উন্নয়নের বলি হয়ে আজ তা কেবলই স্মৃতি।
উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে গিয়ে কি হারিয়ে ফেলতে হচ্ছে আমাদের শেকড় আর ঐতিহ্য ঢাকা-খাগড়াছড়ি মহাসড়ক নির্মাণের প্রয়োজনে অবশেষে কেটে ফেলা হলো প্রায় ১৮০ বছরের পুরনো একটি ঐতিহাসিক বটগাছ। ফটিকছড়ির হেয়াকো ফুলছড়ি ও পূর্বসোনাই সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত স্থানীয়দের কাছে ‘চেগাইয়া বটগাছ’ নামে পরিচিত এই গাছটি কেবল একটি উদ্ভিদই ছিল না, ছিল শতবর্ষের ইতিহাস ও লোকবিশ্বাসের এক জীবন্ত দলিল।
যুগের পর যুগ ধরে পথচারী ও স্থানীয়দের ছায়া দিয়ে আসা এই বিশাল বটগাছটি দেশ-বিদেশের ভ্রমণপিপাসু ও সাধারণ মানুষের কাছেও বেশ পরিচিত ছিল। কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই গাছটিকে ঘিরে ছিল নানা গল্প ও জনশ্রুতি। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বহু বছর ধরে এই গাছের গোড়ায় মাঝেমধ্যেই লাল কাপড় বাঁধা হতো, জ্বলতো মোমবাতি। এমনকি মানসিক ভারসাম্যহীন বা ভবঘুরে লোকজনের আনাগোনাও চোখে পড়ত প্রায়ই।
কেউ কেউ গাছটিকে আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক মনে করে গভীর শ্রদ্ধা করতেন, আবার অনেকের কাছেই এসব ছিল স্রেফ কাল্পনিক গল্প বা কুসংস্কার। তবে এসব বিতর্ক ছাপিয়ে গাছটির একটি খুব সুন্দর রূপ ছিল প্রতিদিনের গোধূলিলগ্নে। প্রতি বিকেলে সূর্য ডোবার ঠিক আগমুহূর্তে হাজারো পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠত পুরো এলাকা, যা বিমোহিত করত পথচারীদের মন।
কিন্তু উন্নয়নের আধুনিক স্রোতে সেই চিরচেনা রূপ আজ হারিয়ে গেছে। সড়ক প্রশস্তকরণ ও নিরাপদ যাতায়াতের স্বার্থে শতবর্ষী এই ঐতিহ্যকে কোপাতে হয়েছে বুলডোজার ও করাতের মুখে।
উন্নয়ন অপরিহার্য, কিন্তু প্রকৃতির কোল থেকে এমন একেকটি প্রাচীন ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়া আমাদের স্মৃতির পাতায় এক শূন্যতা তৈরি করে। চেগাইয়া বটগাছের কাটা পড়ার মধ্য দিয়ে শেষ হলো প্রায় দুই শতাব্দীর এক জীবন্ত অধ্যায়।













