৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা দলের বড় একটি অংশের দাবি, রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির বর্তমান সভাপতি দীপন তালুকদার দীপু এবং তার একটি বিশেষ সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ কর্মী ও ৯০% ত্যাগী নেতা দীর্ঘদিন ধরে জিম্মি হয়ে আছেন। এই শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতাদের পুনর্বাসন, কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন এবং বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর রাঙ্গামাটি জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক সুরক্ষা দিতে জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব গোপনে লিয়াজোঁ বজায় রেখে চলেছেন। অভিযোগ রয়েছে, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী মো. মুসা মাতব্বর এর কাছ থেকে ২ কোটি টাকা, সাংগঠনিক সম্পাদক সাওয়ালের কাছ থেকে ১ কোটি টাকা এবং জেলা যুবলীগের সভাপতি ও পৌরসভার সাবেক মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরীর কাছ থেকে ২ কোটি টাকা নিয়ে তাদের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য সচল রাখা হয়েছে। বিপুল অঙ্কের এই অর্থ লেনদেনের বিনিময়ে আওয়ামী লীগের ওইসব নেতাদের আত্মগোপনে থাকা এবং তাদের অবৈধ সম্পদ রক্ষায় সহযোগিতা করা হচ্ছে।
এছাড়া দীপন তালুকদার দীপুর ছত্রছায়ায় রাঙ্গামাটি জেলায় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও সিন্ডিকেট রাজত্ব চলছে বলে স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ। এর মধ্যে অন্যতম হলো পার্বত্য অঞ্চলের মূল্যবান সেগুন গাছ চোরাচালান, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বিদেশি সিগারেটের অবৈধ ব্যবসা এবং অবাধে মাদক কারবার।
এর পাশাপাশি ক্ষমতার পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ নেতাদের মালিকানাধীন বিভিন্ন লাভজনক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সম্পদ জোরপূর্বক ভোগদখল করা হচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে ‘তাজমহল রিসোর্ট’ এবং সাজেকের পাহাড়সহ বিভিন্ন পর্যটন রিসোর্ট। এছাড়া জেলার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি খাতের ঠিকাদারি এবং টেন্ডারবাজি এখন এই সিন্ডিকেটের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে। দীর্ঘ ১৭-১৮ বছর ধরে এরা ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে কোনো জোরালো আন্দোলন না করে, পর্দার আড়ালে টেন্ডারবাজি, শিক্ষক নিয়োগ ও চাকরি বাণিজ্যের মাধ্যমে নিজেদের পকেট ভারী করেছে।
এই পুরো অবৈধ সাম্রাজ্য ও দখলদারিত্বের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনায় জেলা বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কিছু বিতর্কিত নেতার সরাসরি সম্পৃক্ততা মিলেছে। এর মধ্যে রাঙ্গামাটি জেলা কৃষকদলের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়তোষ চাকমার নাম জোরালোভাবে সামনে এসেছে। তিনি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপু তালুকদারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত অনুসারী হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, প্রিয়তোষ চাকমা দীপুর ছত্রছায়ায় থেকে জেলার যাবতীয় চোরাচালান, মাদক ব্যবসা এবং রিসোর্ট দখলের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় করছেন।
তৃণমূলের ক্ষোভকে আরও উস্কে দিয়েছে বর্তমান নেতৃত্বের নতুন তৎপরতা। শোনা যাচ্ছে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে রাঙ্গামাটির দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত প্রতিষ্ঠান—’পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড’ এবং ‘রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ’-এর চেয়ারম্যান ও সদস্য পদ বাগিয়ে নিতে এই সিন্ডিকেট কেন্দ্রে জোর লবিং চালাচ্ছে।
সাধারণ নেতাকর্মী ও স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়, লোভী ও স্বার্থপর হিসেবে পরিচিত এই নেতারা যদি এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে আসেন, তবে রাঙ্গামাটিতে কোনো উন্নয়ন হবে না। উল্টো তারা নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকবেন, যা রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির সুনাম পুরোপুরি নষ্ট করবে এবং দলের ভাবমূর্তি সংকটে ফেলবে।
দীর্ঘদিন ধরে মামলা-হামলার শিকার হওয়া রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির তৃণমূলের প্রকৃত ত্যাগী ও আদর্শবান কর্মীরা এখন এই নেতৃত্ব থেকে মুক্তি চান। তাদের মতে, রাজনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত এই নপুংসকসুলভ নেতৃত্বের কারণে দল জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শকে যারা মনেপ্রাণে ভালোবাসেন, তারা অবিলম্বে সভাপতি দীপন তালুকদার দীপু ও তার সহযোগী প্রিয়তোষ চাকমাসহ পুরো গংকে দল থেকে বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে পার্বত্য অঞ্চলের রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ফেরাতে বিএনপির কেন্দ্রীয় হাই কমান্ডের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তৃণমূলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা।









