লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে দিনে-দুপুরে ঘরে ঢুকে মা ও তাঁর তিন মেয়েকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনার রোমহর্ষক রহস্য উন্মোচন হয়েছে। কোনো সাম্প্রদায়িক উসকানি বা ধর্মীয় বিরোধ নয়, বরং মাদকাসক্তি, একতরফা বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান এবং বখাটেপনার চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই এই চার হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে জানা গেছে। ঘটনাটি প্রমাণ করেছে যে, অপরাধীর কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা জাত থাকে না; তার একমাত্র পরিচয় সে একজন হিংস্র অপরাধী।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দেড় বছর আগে একই ভবনের পাঁচ তলায় ভাড়া থাকতেন অনন্ত মজুমদার (অন্তর) নামের এক বিবাহিত যুবক। বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি ওই বাড়ির বাসিন্দা শাহিনূর আক্তারের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বড় মেয়ে সায়মা আক্তারকে প্রতিনিয়ত উত্যক্ত করতেন এবং বিয়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করতেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, অন্তরের এই বেপরোয়া আচরণের পেছনে এলাকার কিছু মাদক স্পট ও বখাটেদের আড্ডা দায়ী ছিল। পরবর্তীতে মাদক সেবনের অভিযোগে স্থানীয় বাসিন্দাদের চাপে অন্তরকে ওই ভবন থেকে বের করে দেওয়া হয়।
ভবন থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর ঘাতক অন্তর দলবল নিয়ে সায়মার পরিবারকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে পরিবারটি তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে অন্তর সায়মার পরিবারকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেয়।
ঘটনার দিন সকালে পূর্বপরিকল্পিতভাবে পানির মিস্ত্রি সেজে কৌশলে ওই বাসায় প্রবেশ করে অন্তর। ঘরে ঢুকেই সে ধারালো অস্ত্র নিয়ে সায়মার ওপর চড়াও হয়। মেয়ের চিৎকার শুনে মা এবং অন্য দুই বোন এগিয়ে এলে মদ্যপ ও উন্মাদ অন্তর সবাইকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। ঘটনাস্থলেই মা ও দুই মেয়ে প্রাণ হারান এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথে মেজো বোন ইকরাও শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর সচেতন মহল মনে করছেন, ঘটনাটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক বার্তা দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের একটি শ্রেণি এবং এদেশীয় কিছু স্বার্থান্বেষী মহল বাংলাদেশে ‘সংখ্যালঘু নির্যাতন’-এর যে মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে, এই ঘটনা সেই অপপ্রচারকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে।
খোদ সনাতন ধর্মাবলম্বী ও সচেতন নাগরিকরা বলছেন, বাংলাদেশে যদি হিন্দু সম্প্রদায় সত্যিই নির্যাতিত বা কোণঠাসা হতো, তবে অন্তরের মতো একজন বিবাহিত ও সনাতন ধর্মাবলম্বী যুবকের পক্ষে একজন মুসলিম তরুণীকে উত্যক্ত করার দুঃসাহস হতো না। বা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে একটি মুসলিম পরিবারের ওপর এমন নৃশংস হামলা চালানোর সাহস সে পেত না।
এ দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একাংশের অভিমত, যারা বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের ভুয়া ন্যারেটিভ বা গুজব ছড়াচ্ছে, তারা আসলে নিজেদের ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠী স্বার্থ হাসিলের জন্য বাংলাদেশ-বিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। বাংলাদেশ আবহমানকাল ধরেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ এবং এখানে অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই বিচার করা হয়, তার ধর্মীয় পরিচয় দেখে নয়।
স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘাতক অন্তরের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশ্বাস দিয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো মাদকাসক্ত ও বখাটে এভাবে কোনো পরিবারের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করার সাহস না পায়।



















